প্রকাশ : ২৬ মে ’২৬ খ্রি. মঙ্গলবার
জেষ্ঠ্য প্রতিবেদক :
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে সরকার। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতে সহায়তা বাড়ানো এবং উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারায় ফেরার লক্ষ্য সামনে রেখে আগামী অর্থবছরের জন্য প্রাথমিকভাবে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাবের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
অর্থ বিভাগের প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী বাজেটের মূল অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে রয়েছে নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, ২০৪১ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত হওয়ার লক্ষ্যে উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারা ফিরিয়ে আনা এবং কল্যাণমূলক অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করা।
এ ছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা খাত সম্প্রসারণ, উদ্যোক্তা তৈরি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ভৌত ও সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন, গবেষণা ও বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা, জনগণের দোরগোড়ায় চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া, আর্থিক খাত পুনর্গঠন, কৃষি সহায়তা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সৃজনশীল অর্থনীতি বিশেষ করে চলচ্চিত্র, সংগীত, ক্রীড়া ও গ্রামীণ সংস্কৃতি খাতের বিকাশেও সহায়তার পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বিভিন্ন খাতে বাড়তি ভর্তুকির চাপ, প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামোর সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণে বিপুল অর্থের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়েই বড় আকারের বাজেট প্রস্তাব করা হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় আগামী বাজেট প্রায় ১৮ শতাংশ বড় হতে পারে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার সাত লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিয়েছিল, যা পরে সংশোধন করে সাত লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকায় নামানো হয়। সে সময় উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে ভর্তুকি ও অনুন্নয়ন ব্যয় বাড়ানো হয়েছিল।
এদিকে বাড়তি ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে আগামী অর্থবছরের জন্য ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যা চলতি বাজেটের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ২৩ শতাংশ বেশি। অথচ সাধারণত অর্জিত রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১২ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছিল চার লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা। চলতি সংশোধিত বাজেটে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা ধরা হলেও প্রকৃত আদায় পাঁচ লাখ কোটি টাকার বেশি হবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। সে হিসাবে আগামী অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে চলতি অর্থবছরের সম্ভাব্য আদায়ের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে।
সরকারের মোট রাজস্বের প্রায় ৮০ শতাংশ আদায়কারী সংস্থা এনবিআরের জন্য আগামী বাজেটে ছয় লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। অথচ চলতি অর্থবছরের পাঁচ লাখ তিন হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন থেকেই অনেক পিছিয়ে রয়েছে সংস্থাটি। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে শুল্ক-কর আদায়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা, যা অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় সর্বোচ্চ।
বর্তমান লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে অর্থবছরের বাকি সময়ে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকা কর আদায় করতে হবে এনবিআরকে। এ জন্য প্রায় ৩৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে, যা সংশ্লিষ্টদের মতে অত্যন্ত কঠিন।
সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ সমকালকে বলেন, সরকারের ব্যয় মেটাতে এবং ঋণের চাপ কমাতে রাজস্ব বাড়ানো অপরিহার্য। তবে মূল প্রশ্ন হচ্ছে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা কতটা বাস্তবসম্মত এবং তা অর্জনে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, এনবিআর প্রতিবছর উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন করে না। বড় ধরনের সংস্কার ছাড়া এ ধরনের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।
রাজস্ব বাড়াতে সরকার অটোমেশন, করের আওতা সম্প্রসারণ, প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং করবহির্ভূত আয় বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে। একই সঙ্গে বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনাও বাড়ানো হচ্ছে। নতুন বাজেটে মোট ঋণের পরিমাণ দুই লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হতে পারে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেওয়া হবে এক লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে এক লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। অর্থ বিভাগের সামষ্টিক প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে।
নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বড় ধরনের সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এর মধ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আগামী অর্থবছরে এ দুই কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়িয়ে ৮৩ লাখে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ জন্য নতুন বাজেটে ১৩ হাজার ৪৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।







