প্রকাশ : ০৬ জুন ’২৬ খ্রি. শনিবার
দেশ প্রতিবেদক, বাগেরহাট :
ফারাক্কা বাঁধের কারণে উজানের মিঠা পানির প্রবাহ বন্ধ। শিল্প-কারখানার বর্জ্য পড়ছে সুন্দরবনের প্রাণ পশুর নদীতে। ২৩ বছরে ২৭ বার আগুন। নানান সমস্যায় হুমকির মুখে পড়েছে সুন্দরবনের জীববৈচির্ত্য। প্রাকৃতিক ও মনুষ্য সৃষ্ট এ দুই কারণেই বনের প্রাণ-প্রকৃতি মারাতœকভাবে বিনষ্ট হচ্ছে। তবে প্রাকৃতিক ক্ষয়ক্ষতির তুলনায় মনুষ্য সৃষ্ট কর্ম কান্ডে বেশি হুমকিতে রয়েছে সুন্দরবন। প্রাকৃতিকভাবে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হলেও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যাগুলো বনের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি সাধন করছে। এর সঙ্গে রয়েছে ফারাক্কা বাঁধের প্রভাব। ফারাক্কার কারণে উজানের মিঠা পানির প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লবণাক্ততা কুঁড়ে খাচ্ছে সুন্দরবনকে। রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এখন সুন্দরবন ধ্বংসের অন্যতম কারণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। বন বিভাগ, পরিবেশবিদ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, সুন্দরবনের অভ্যন্তরে অসংখ্য নদী-খাল রয়েছে। এসব নদী-খালে রয়েছে মাছের প্রাচুর্যতা। কিন্তু অতি মুনাফালোভী জেলেরা এসব খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার করছেন। এতে মাছের প্রজনন কমে যাওয়ার পাশাপাশি বিষ মিশ্রিত মাছ খেয়ে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। সেইসঙ্গে বিষমিশ্রিত পানি বনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে। এই পানি পান করছে বনের পশু-পাখী। ফলে হুমকিতে রয়েছে সুন্দরবনের প্রাণীকূল। সুন্দরবন দিয়ে প্রবাহমান পশুর নদী দূষণ হচ্ছে কয়লাভিত্তিক রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারণে। সরকারি সংস্থা সিইইজিএসের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, পশুর নদীর পানিতে বিষাক্ত সিসার (মার্কারি) পরিমাণ বাড়ছে। নদীতে সহনীয় মাত্রার চেয়ে ১০ গুণ মার্কারি বেড়েছে। এতে জলজ প্রাণীর ক্ষতি ও বায়ু দূষণে মানুষেরও ক্ষতি হচ্ছে শিল্প দূষণে সুন্দরবনের ক্ষতিও কোনো অংশে কম নয়। সুন্দরবনের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে প্রতি বেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) শিল্পায়ন গড়ে উঠেছে। এসব শিল্প-কারখানার বর্জ্য পড়ছে সুন্দরবনের প্রাণ পশুর নদীতে। আর পশুর নদীর জোয়ার-ভাটায় তা প্রবেশ করছে বনের অভ্যন্তরে। আর এতে বনের জীববৈচির্ত্য ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে প্রতিনিয়তই। প্লাস্টিক ও পলিথিন দূষণের শিকারও সুন্দরবন। সম্প্রতি এক গবেষণায় সুন্দরবন সংলগ্ন মোংলা, পশুর ও রুপসা নদীর ১৭ প্রজাতির মাছে মাইক্রো প্লাস্টিকের কণা পাওয়া গেছে। এই মাইক্রো প্লাস্টিকের কণার পরিমাণ সবচেয়ে বেশি মিলেছে সুন্দরবনের হরিণা চিংড়িতে। এ মাছে মানবদেহে ক্যানসার ও লিভার ঝুঁকি বাড়ছে। সম্প্রতি ব্রাজিলের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ মোট সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় এ তথ্য পাওয়া গেছে। সূত্র বলছে, সুন্দরবনের বাঘসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী পাচারে আন্তর্জাতিক চোরাকারবারি চক্র সক্রিয় রয়েছে। বন্যপ্রাণী অপরাধ দমনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো এসব অপরাধীদের গ্রেফতার করতে না পারা। ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটির (ডব্লিউসিএস) গবেষণা অনুযায়ী, বন্যপ্রাণী অপরাধের মাত্র ৩০ শতাংশ আসামি গ্রেফতার হন। মামলায় সাজা কম ও মামলার দীর্ঘসূত্রিতা রয়েছে। তাই মামলা শেষে আবার তারা অপরাধে জড়াচ্ছেন। সুন্দরবনের নদীতে তেল, কয়লা, সার ও ক্লিংকার বোঝাই জাহাজডুবিতে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে জীব বৈচির্ত্যের। নৌযান থেকে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে নদীতে। নৌযানের ঢেউয়ে বনে ভাঙন ধরছে। নদীতে বিলীন হচ্ছে গাছপালা। নৌযানের বিকট শব্দে বন্যপ্রাণীর বিচরণ ও প্রজনন বিঘিœত হচ্ছে। একই কারণে ডলফিনের অভয়াশ্রম ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে সুন্দরবনের ৫৫ ভাগ এলাকাই অভয়াশ্রম। সেই অভয়াশ্রম ও এখন আর নিরাপদ নেই বলছেন গবেষকরা। নিষিদ্ধ অভয়াশ্রমে এক শ্রেণির অসাধু বন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের সহায়তায় সারা বছরই মাছ শিকার করেন অসৎ জেলেরা। ফলে অভয়াশ্রমও ধ্বংস হচ্ছে।








