১৯ মে ’২৬ খ্রি. মঙ্গলবার
এ এম ইমদাদুল ইসলাম
সকাল আটটার আগেই উপজেলা ভূমি অফিসের সামনে লম্বা লাইন পড়ে গেছে। হাতে পুরোনো ফাইল, নীল রঙের একটি ব্যাগ আর চোখেমুখে ক্লান্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আব্দুল করিম। বয়স প্রায় ষাট। মাথার চুল পেকে গেছে অনেক আগেই। তবু আজও তিনি ছুটছেন বাবার রেখে যাওয়া তিন বিঘা জমির কাগজ ঠিক করতে। করিমের বাবা মারা গেছেন প্রায় পনেরো বছর আগে। গ্রামের বাড়ি গাজীপুরের এক প্রত্যন্ত এলাকায়। ছোট্ট সেই জমিটুকুই ছিল পরিবারের ভরসা। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর থেকেই শুরু হয় ঝামেলা। নামজারি হয়নি, খতিয়ানে পুরোনো মালিকের নাম রয়ে গেছে, আর ভূমি উন্নয়ন কর বকেয়া দেখাচ্ছে কয়েক বছরের।
প্রথম প্রথম করিম ভাবতেন, “একদিন সময় করে সব ঠিক করে ফেলব।” কিন্তু সময় যেন কখনো তার হাতে আসেনি। কখনো টাকা নেই, কখনো অফিসে গিয়ে শুনেছেন কর্মকর্তা নেই, আবার কখনো নতুন কোনো কাগজের তালিকা ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আজ তিনি এসেছেন ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করতে। গত মাসে ইউনিয়নের এক ব্যক্তি এসে বলেছিল, কর না দিলে নাকি পরে সমস্যা হবে। তাই সব কাজ ফেলে সকালে রওনা দিয়েছেন। লাইন একটু একটু করে এগোয়। ঘাম আর গরমে মানুষ বিরক্ত। হঠাৎ পেছন থেকে একজন ফিসফিস করে বলল “চাচা, দ্রুত কাজ করাইতে চাইলে বলেন। না হলে সারাদিন লাগব।” করিম বুঝতে পারেন লোকটা দালাল। তিনি মুখ ঘুরিয়ে নেন। এসব লোককে তিনি ভয়ও পান, আবার ঘৃণাও করেন। কিন্তু আশপাশে তাকিয়ে দেখেন, অনেকেই চুপিচুপি তাদের হাতে টাকা তুলে দিচ্ছে। দেড় ঘণ্টা পর তার সিরিয়াল আসে। ডেস্কে বসা কর্মচারী কাগজ দেখে ভ্রু কুঁচকে বলল “এই খতিয়ান তো আপডেট না। আগে নামজারি করেন, তারপর কর দেবেন।”
করিম হতভম্ব হয়ে বলেন “বাবা, আমি তো আগে কয়েকবার আইছি। কেউ তো এই কথা কয় নাই!” কর্মচারী বিরক্ত গলায় বলে “আগে কে কী বলছে জানি না। নিয়ম এইটাই।” তারপর পাশের আরেকটি কক্ষের দিকে ইশারা করে দেয়। করিম ধীরে ধীরে সেখানে যান। নতুন লাইনে দাঁড়ান। আবার অপেক্ষা। দুপুর গড়িয়ে বিকেল। পকেটে থাকা একশ টাকার নোটগুলো কমতে থাকে ভাড়া, ফটোকপি, আবেদন ফরম, চা-নাস্তা। একসময় তিনি ক্লান্ত হয়ে বেঞ্চে বসে পড়েন। মনে পড়ে যায় বাবার কথা। বাবা বলতেন, “জমি মানুষের শক্তি।” অথচ সেই জমিই আজ তার সবচেয়ে বড়ো দুর্ভোগ।
বিকেলের দিকে এক তরুণ কর্মকর্তা তার কাছে এসে নরম গলায় জানতে চাইলেন “চাচা, কী সমস্যা? করিম ধীরে ধীরে সব খুলে বলেন। কর্মকর্তা কম্পিউটারে কিছু খোঁজাখুঁজি করে জানান, এখন অনলাইনে আবেদন করা যায়, করও ডিজিটাল পদ্ধতিতে দেওয়া সম্ভব। তবে এজন্য জাতীয় পরিচয়পত্র, উত্তরাধিকার সনদ আর কিছু কাগজ আপলোড করতে হবে। করিম অসহায়ের মতো তাকিয়ে বলেন “বাবা, এইসব আমি বুঝি না। আমার তো স্মার্টফোনও নাই।” তরুণ কর্মকর্তা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। তারপর পাশের একজনকে ডেকে বলেন, “চাচার আবেদনটা করে দেন।” সন্ধ্যার আগ মুহূর্তে করিম অফিস থেকে বের হন। কাজ পুরো শেষ হয়নি, কিন্তু শুরু হয়েছে। হাতে নতুন একটি রিসিট। চোখে একটু স্বস্তি। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। শহরের বাতিগুলো জ্বলে উঠছে। তিনি ভাবেন, এই দেশ বদলাচ্ছে হয়তো। কিন্তু গ্রামের সাধারণ মানুষের জন্য সেই বদলের পথ এখনও অনেক দীর্ঘ। তারপর ধীরে ধীরে তিনি বাসস্ট্যান্ডের দিকে হাঁটতে থাকেন বগলের নিচে শক্ত করে চেপে রাখা পুরোনো খতিয়ানের কাগজ।
বাংলাদেশে ভূমি ব্যবস্থাপনার জটিলতা শুধু প্রশাসনিক নয়, এটি একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। গ্রামের বহু পরিবারে ভূমি সংক্রান্ত বিরোধের কারণে দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিক সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত জমির সঠিক রেকর্ড না থাকা, একাধিক মালিকানা দাবি এবং পুরোনো খতিয়ানের অসংগতি সাধারণ মানুষের জন্য বাড়তি অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ফলে ভূমি অফিস শুধু সেবাকেন্দ্র নয়, অনেক ক্ষেত্রে মানুষের জন্য এক ধরনের মানসিক চাপের জায়গায় পরিণত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ কেবল প্রযুক্তিগত সংস্কার নয়, বরং সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
বাংলাদেশে ভূমি নিয়ে মানুষের ভোগান্তির ইতিহাস অনেক পুরোনো। খতিয়ান, নামজারি, জমির পর্চা কিংবা কর পরিশোধ, এসব কাজের জন্য একসময় মানুষকে দিনের পর দিন অফিসে ঘুরতে হতো। সেই চিত্র বদলে দিতে সরকার গত কয়েক বছরে ভূমি ব্যবস্থাপনাকে ডিজিটাল রূপ দিয়েছে। এই ধারাবাহিকতায় আয়োজিত “ভূমি সেবা মেলা ২০২৬” হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষের জন্য এক অনন্য সেবামুখী আয়োজন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ১৯ মে মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে “ভূমি সেবা মেলা ২০২৬” উদ্বোধন করেছেন। ভূমি নিয়ে মানুষের ভোগান্তির থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য সকলকে সচেষ্ট হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এ মেলায় নাগরিকরা সরাসরি বিভিন্ন ভূমি সেবা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন। মেলার মূল উদ্দেশ্য হলো ভূমি অফিসের সেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া, সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনার প্রতি জনগণের আস্থা তৈরি করা।
প্রযুক্তিনির্ভর সেবার বিস্তার ঘটছে ভূমি সেবা মেলায়। ভূমি সেবা মেলায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে অনলাইনভিত্তিক সেবা। নাগরিকরা এখানে ই-নামজারি আবেদন, খতিয়ান যাচাই, ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ, মৌজা ম্যাপ দেখা এবং অনলাইন আবেদনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে হাতে-কলমে ধারণা পাচ্ছেন। তরুণ প্রজন্ম যেমন প্রযুক্তিভিত্তিক সেবায় আগ্রহী, তেমনি বয়স্ক মানুষদেরও স্বেচ্ছাসেবক ও কর্মকর্তারা সহায়তা করছেন। মেলায় স্থাপিত বিভিন্ন বুথে কর্মকর্তারা নাগরিকদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন এবং তাৎক্ষণিক সমস্যার সমাধান দিচ্ছেন। বিশেষ করে নারী, প্রবীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য আলাদা সহায়তা ডেস্ক মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
ডিজিটাল রূপান্তরের এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি। শহর ও গ্রামের মধ্যে ডিজিটাল বিভাজন এখনও স্পষ্টভাবে বিদ্যমান। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট সংযোগ এবং ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব অনেক মানুষকে অনলাইন সেবার বাইরে রাখছে। ফলে ভূমি সেবার ডিজিটালাইজেশন যতটা না প্রযুক্তির বিষয়, তার চেয়ে বেশি একটি সক্ষমতা উন্নয়নমূলক উদ্যোগ। এই কারণে ভূমি সেবা মেলায় প্রশিক্ষণমূলক সেশন, সহায়তা ডেস্ক এবং ফিল্ড-লেভেল গাইডেন্সকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষ ধাপে ধাপে ডিজিটাল সেবার সঙ্গে অভ্যস্ত হতে পারে।
দুর্নীতি ও হয়রানি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে ভূমি সেবাকে প্রযুক্তিনির্ভর করার মাধ্যমে।ভূমি সংক্রান্ত জটিলতা ও দালালচক্র দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের উদ্বেগের কারণ ছিল। ভূমি সেবা মেলার মাধ্যমে সরকার জনগণকে সরাসরি সরকারি সেবার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করছে। এতে মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরতা কমছে এবং মানুষ সহজে সরকারি নিয়ম-কানুন জানতে পারছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ডিজিটাল সেবার প্রসারের ফলে সেবাপ্রাপ্তির সময় কমেছে এবং স্বচ্ছতা বেড়েছে। নাগরিকদের অভিযোগ গ্রহণ ও তাৎক্ষণিক সমাধানের ব্যবস্থাও মেলায় যুক্ত করা হয়েছে।
সচেতনতা তৈরিতে ব্যতিক্রমী আয়োজন ভূমি সেবা মেলা ২০২৬। মেলায় শুধু সেবা নয়, রয়েছে সচেতনতামূলক নানা আয়োজনও। ভূমি আইন, উত্তরাধিকার, জমি রেজিস্ট্রেশন ও কর ব্যবস্থাপনা নিয়ে সেমিনার, আলোচনা সভা ও ভিডিও প্রদর্শনী আয়োজন করা হচ্ছে। শিক্ষার্থী ও তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়াতে কুইজ, বিতর্ক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অনেক জায়গায় দেখা গেছে, মানুষ পরিবারসহ মেলায় এসে ভূমি সেবা সম্পর্কে জানছেন। এতে সরকারি সেবাকে ঘিরে মানুষের ভীতি ও দূরত্ব কমছে।
মেলায় আসা মানুষের প্রত্যাশা ঝামেলা ও হয়রানিমুক্ত দ্রুত ভূমি সেবা নিশ্চিত করা। আগে ভূমি অফিস মানেই ছিল ঝামেলা ও দীর্ঘসূত্রতা। এখন অনলাইনে আবেদন ও দ্রুত সেবা পাওয়ার সুযোগ জনগণকে আশাবাদী করছে। তবে সেবার মান ধরে রাখতে সার্ভার সক্ষমতা বৃদ্ধি, জনবল উন্নয়ন এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ডিজিটাল প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ বিশিষ্ট জনদের।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমি ব্যবস্থাপনায় টেকসই পরিবর্তন আনতে হলে কেবল প্রযুক্তি নয়, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং মানবসম্পদ দক্ষতার সমন্বয় অপরিহার্য। মাঠপর্যায়ের অফিসগুলোতে নিয়মিত মনিটরিং, সেবার মানদণ্ড নির্ধারণ এবং অভিযোগ ব্যবস্থার কার্যকর বাস্তবায়ন না হলে ডিজিটাল সিস্টেমও কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে ব্যর্থ হতে পারে। তাই ভূমি সেবা মেলা যেমন জনগণের আস্থা তৈরি করছে, তেমনি এই আস্থাকে ধরে রাখতে প্রশাসনিক সংস্কারের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
“ভূমি সেবা মেলা ২০২৬” শুধু একটি প্রশাসনিক আয়োজন নয়; এটি নাগরিকবান্ধব ভূমি ব্যবস্থাপনার প্রতীক। প্রযুক্তির ব্যবহার, স্বচ্ছতা এবং জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে ভূমি খাতে নতুন সংস্কৃতির সূচনা হয়েছে। একসময় যে ভূমি অফিস মানুষের কাছে আতঙ্কের নাম ছিল, এখন সেটিই ধীরে ধীরে সেবাবান্ধব প্রতিষ্ঠানে রূপ নিচ্ছে। আর সেই পরিবর্তনের বার্তাই ছড়িয়ে দিচ্ছে ভূমি সেবা মেলা।
লেখক: জনসংযোগ কর্মকর্তা, খাদ্য মন্ত্রণালয়








