০৮ মে ’২৬ খ্রি. শুক্রবার সকাল ৯.৪৫ মিনিট
দেশ ডেস্ক :
মার্কিন নৌবহরকে ঠেকাতে এ বার গুপ্ত হাতিয়ার ব্যবহারের হুঁশিয়ারি দিল ইরান। এর সাঙ্কেতিক নাম ‘হুট’। আদৌ কি আমেরিকার রণতরী ধ্বংস করতে পারবে এই সুপার টর্পেডো?
‘ব্যাটেল গ্রাউন্ড’ হরমুজ় প্রণালীতে চড়ছে পারদ! বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চুপ করে বসে নেই ইরানও। যুক্তরাষ্ট্রের নৌঅবরোধকে ধ্বংস করতে ‘গোপন অস্ত্র’ প্রয়োগের হুমকি দিয়েছে তেহরান। শুধু তা–ই নয়, সংশ্লিষ্ট হাতিয়ারটি আমেরিকার ‘হৃৎকম্পের কারণ’ হতে পারে বলেও হুঁশিয়ারি দিতে শোনা গিয়েছে সাবেক পারস্যের শিয়া ফৌজকে।
ইরানি নৌবাহিনীর ওই গোপন অস্ত্রটির সাঙ্কেতিক নাম ‘হুট’। ফার্সি ভাষায় এর অর্থ হল তিমি। একে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগামী ডুবো হাতিয়ার বলে দাবি করেছে তেহরান। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, ‘হুট’ প্রকৃতপক্ষে এক ধরনের ‘সুপার ক্যাভিটেটিং টর্পেডো’। গত শতাব্দীর ৯০–এর দশকে তা প্রথম আবিষ্কার করে রাশিয়া, আজও যা ব্যবহার করছে মস্কোর নৌবাহিনী। ক্রেমলিনের এই শ্রেণির ব্রহ্মাস্ত্রের পোশাকি নাম ‘ভিএ–১১১ শকভাল’।
শত্রুর রণতরী বা ডুবোজাহাজ ধ্বংস করতে জলের নীচে এক ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে নৌবাহিনী। সেই হাতিয়ারকেই বলা হয় টর্পেডো। সংশ্লিষ্ট অস্ত্রটি যুদ্ধজাহাজ ও ডুবোজাহাজ, দুই জায়গা থেকেই ব্যবহার হয়ে থাকে। তবে গতি ও আঘাত হানার ক্ষমতার নিরিখে সুপার টর্পেডো ‘হুট’ আর পাঁচটা প্রচলিত টর্পেডোর চেয়ে আলাদা। আর তাই কেউ কেউ একে ‘হাইপারসনিক’ (শব্দর চেয়ে পাঁচ গুণ গতিশীল) ডুবো হাতিয়ার বলেও উল্লেখ করছেন।
সাধারণত, প্রচলিত টর্পেডোর গতিবেগ হয় ঘণ্টায় ৬০–১০০ কিলোমিটার। ইরান জানিয়েছে, জলের নীচে ঘণ্টায় ৩৬০ কিলোমিটার বেগে ছুটতে পারে তাদের তৈরি ‘হুট’। সামরিক বিশ্লেষকদের কথায়, তেহরানের দাবি সত্যি হলে সংশ্লিষ্ট ব্রহ্মাস্ত্রটিকে যুগান্তকারী আবিষ্কার বলতে হবে। কারণ, জলের ঘনত্ব বাতাসের চেয়ে ১,০০০ গুণ বেশি হওয়ায় সেখানে দ্রুত গতিশক্তি হারিয়ে ফেলে যে কোনও হাতিয়ার।
এ–হেন ‘হুট’-এর ব্যাপারে খুব কম তথ্যই প্রকাশ্যে এনেছে ইরান। তবে পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির দাবি, ২০০ কেজির বেশি বিস্ফোরক বহনে সক্ষম তেহরানের এই সুপার টর্পেডো। অন্য দিকে জলের নীচের প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্রগুলির নিরিখে এর পাল্লা খুবই কম। সেটা মাত্র ১৫ কিলোমিটার। সেখানে প্রচলিত টর্পেডোগুলি প্রায় ৩০ কিলোমিটার, অর্থাৎ দ্বিগুণ রাস্তা অতিক্রম করে ওড়াতে পারে শত্রুর রণতরী বা ডুবোজাহাজ।
১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘ঠান্ডা লড়াই’য়ে জড়িয়ে পড়ে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন। ফলে দুই ‘সুপার পাওয়ার’ রাষ্ট্রের মধ্যে শুরু হয় অস্ত্রের প্রতিযোগিতা। এই পর্বে ৭০–এর দশকে সুপার টর্পেডো তৈরিতে কোমর বেঁধে লেগে পড়েন মস্কোর প্রতিরক্ষা বিজ্ঞানীদের একাংশ। ফলে কয়েক দিনের মধ্যেই জলের নীচের ব্রহ্মাস্ত্রটির জন্য বিশেষ ধরনের একটি কঠিন জ্বালানিচালিত (সলিড ফুয়েল) রকেট মোটর হাতে পায় ক্রেমলিন।![]()
সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, এই প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করেই পরবর্তী কালে ‘শকভাল’-এর মতো ব্রহ্মাস্ত্র তৈরি করে মস্কো। লক্ষ্যের দিকে ছুটে যাওয়ার সময় সংশ্লিষ্ট সুপার টর্পেডোটিকে ঘিরে থাকে একটি গ্যাসের বুদবুদ। আর সেটা তৈরি করে কঠিন জ্বালানি রকেট মোটর। ফলে ঘনত্ব থাকা সত্ত্বেও জলের গভীরে উচ্চ গতি পাচ্ছে ওই হাতিয়ার। এর পোশাকি নাম ‘সুপার–ক্যাভিটেশন’।
সাবেক নৌকর্তাদের কথায়, জল চিরে গিয়ে শত্রুর রণতরী বা ডুবোজাহাজে আঘাত হানে প্রচলিত টর্পেডো। কিন্তু, ‘হুট’ বা ‘শকভাল’–এর মতো হাতিয়ারের কার্যপদ্ধতি তার থেকে পুরোপুরি আলাদা। জল কেটে যাওয়ার পরিবর্তে নিজের চারপাশে একটি গ্যাসের বুদবুদ তৈরি করে তারা। ফলে যথেষ্ট গতি নিয়ে লক্ষ্যের দিকে ছুটে যেতে পারে এই ব্রহ্মাস্ত্র। তবে এক বার ছোড়ার পর এগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
সম্প্রতি, ‘হুট’-এর ব্যাপারে গণমাধ্যমে মুখ খোলেন এ দেশের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক সন্দীপ উন্নিথান। তাঁর কথায়, ‘‘২০০৬ সালে সুপার টর্পেডোটির প্রথম সফল পরীক্ষা চালায় ইরান। উচ্চ গতিবেগের কারণে অস্ত্রটিকে চিহ্নিত করা বেশ কঠিন। তবে এর বেশ কিছু দুর্বলতাও রয়েছে।’’ এখনও পর্যন্ত কোনও যুদ্ধে সুপার টর্পেডো ব্যবহার হয়নি। ফলে রণাঙ্গনে এর পারফরম্যান্স কেমন হবে, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মনে যথেষ্ট ধোঁয়াশা রয়েছে। 























