১৭ মে ’২৬ খ্রি. রবিবার
দেশ প্রতিবেদক, বাগেরহাট :
বাগেরহাট জেলার ফকিরহাট উপজেলায় অবস্থিত দেশের একমাত্র পুরুষ শারীরিক প্রতিবন্ধীদের প্রশিক্ষণ ও গ্রামীণ পুনর্বাসন কেন্দ্রটি দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে অচল হয়ে পড়ে আছে। প্রশিক্ষক, যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও কার্যক্রম বন্ধ থাকায় কোটি টাকার সরকারি স¤পদ নষ্ট হচ্ছে। এতে চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন প্রশিক্ষণ প্রত্যাশী প্রতিবন্ধী যুবকেরা। সরেজমিনে দেখা যায়, বাগেরহাট জেলা শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক সংলগ্ন ফকিরহাট উপজেলার মূলঘর এলাকায় প্রায় ৩ একর ৬০ শতক জমির ওপর গড়ে ওঠা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটির চারপাশ এখন আগাছা, ঝোপঝাড় ও বনজঙ্গলে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও অযতেœ পুরো এলাকা একটি পরিত্যক্ত স্থাপনায় রূপ নিয়েছে। প্রধান ফটক অধিকাংশ সময় তালাবদ্ধ থাকে। এটি এখন ভুতুড়ে বাড়িতে পরিণত হয়েছে। আগের সেই প্রাণ চাঞ্চল্য এখন আর নেই। নেই কর্ম তৎপরতা। প্রশিক্ষার্থীদের পদচারণাও নেই। প্রতিষ্ঠানটির ওয়ার্কশপ ট্রেডের প্রশিক্ষক আব্দুস সাত্তার বাসসকে বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বাগেরহাটের কৃতী সন্তান প্রাক্তন সচিব কাজী আজাহার আলীর একান্ত প্রচেষ্টায় ১৯৭৮ সালে এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে ২০১২ সাল থেকে এটি স¤পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। বন্ধ হওয়ার আগে মেকানিক্যাল ওয়ার্কশপ, টেইলারিং এবং হাঁস-মুরগি পালনে প্রশিক্ষণ নিয়ে মোট ৩১৯ জন প্রতিবন্ধী যুবক স্বাবলম্বী হয়েছেন। তিনি জানান, কেন্দ্রটির অনুমোদিত জনবল ছিল ১১ জন। কিন্তু কার্যক্রম বন্ধ থাকায় পর্যায়ক্রমে সবাই অন্যত্র সংযুক্ত হয়েছেন। বর্তমানে মাত্র একজন প্রশিক্ষক কর্মরত আছেন। তিনিও শীঘ্রই অবসরে যাবেন। এতে কেন্দ্রটির ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ২০১০-১১ অর্থবছরে সংগ্রহ করা প্রায় ২১ ধরনের মূল্যবান যন্ত্রপাতি, যেমন- লেদ মেশিন, গ্রাইন্ডিং মেশিনসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ উপকরণ অযতেœ পড়ে থেকে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। গ্যারেজে থাকা ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহন অকেজো হয়ে পড়েছে। হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু পালনের অবকাঠামো প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। এক বছর মেয়াদি আবাসিক কোর্সের মাধ্যমে প্রতি ব্যাচে ৩০ জন করে প্রশিক্ষণ দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে এই কেন্দ্রটির। প্রশিক্ষণ শেষে উপকরণসহ ৪ হাজার টাকা অনুদান এবং সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা দেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে আবাসিক ভবনের সংকট, জনবল ঘাটতি এবং প্রশাসনিক সমন্বয় হীনতার কারণে সম্ভাবনাময় এই প্রতিষ্ঠানটি চালু করা যাচ্ছে না। উল্লেখ্য, কেন্দ্রটি ফকিরহাট উপজেলায় হলেও এর তদারকির দায়িত্বে রয়েছেন খুলনা জেলার তেরোখাদা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা। ফলে কেন্দ্রটির নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ব্যাহত হচ্ছে। সমাজসেবা অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালে আংশিক সংস্কার করা হলেও আবাসিক ভবনের অভাবে কার্যক্রম পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়নি। কর্তৃপক্ষ একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। স্থানীয় প্রতিবন্ধী যুবক রমজান শেখ বলেন, ২০ বছর বয়স থেকে এই কেন্দ্র চালুর অপেক্ষায় আছি। এখন আমার বয়স ৩৪। আদৌ এটি চালু হবে কিনা জানি না। ফকিরহাট উপজেলা বিএনপির সাধারণ স¤পাদক শেখ শরিফুল কামাল বলেন, বাংলাদেশের একমাত্র পুরুষশারীরিক প্রতিবন্ধী প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি অযতেœ অবহেলায় পড়ে আছে। এতে শারীরিক প্রতিবন্ধী যুবকেরা আতœকর্মসংস্থান থেকে স¤পূর্ণ বঞ্চিত হচ্ছে। অন্যদিকে সরকারের কোটি কোটি টাকার সরঞ্জাম নষ্ট হচ্ছে। তিনি বলেন, এই সরকার উন্নয়নমুখী ও জনবান্ধব সরকার। আমার বিশ্বাস প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি দেখবেন। তাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে এই প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় চালুর দাবি জানাচ্ছি। তিনি জানান, এই প্রতিষ্ঠান শি¹িরই চালুর জন্য এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে যথাযথ কর্তৃপক্ষ বরাবর স্মারকলিপি দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। ফকিরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রোকন উজ জামান বলেন, আমি সম্প্রতি এখানে যোগদান করেছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবো। বাগেরহাট জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক সন্তোষ কুমার বলেন, আবাসিক ভবনের ব্যবস্থা করা গেলে বিদ্যমান যন্ত্রপাতি মেরামত করে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পুনরায় চালু করা সম্ভব। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তিনি জানান, সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত শারীরিক প্রতিবন্ধী যুবকদের এই গ্রামীণ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি ১৯৭৮ সালে ফকিরহাট উপজেলায় কার্যক্রম শুরু করে। প্রতি ব্যাচে ৩০ জন করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে ৩ টি ভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হতো। ২০১২ সাল থেকে নিবাসীদের ব্যবহৃত হোস্টেলটি জরাজীর্ণ হওয়ায় প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বন্ধ আছে। এছাড়াও পুরাতন যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষণ সামগ্রী দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় তার কার্যকারিতা নষ্ট হয়েছে। নতুন হোস্টেল নির্মাণ, নতুন যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও জনবল নিয়োগ দিলে এ কেন্দ্রটি আবার চালু করা সম্ভব। যথাযথ পরিকল্পনা, দ্রুত অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের মাধ্যমে কেন্দ্রটি পুনরায় চালু করা গেলে প্রতিবন্ধী যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তাদের সমাজে অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সম্ভব হবে।









