ফাতেমা তুজ জোহরা
প্রকাশ : ২৩ মে ’২৬ খ্রি. শনিবার
৩০ বছর বয়সী নিহার সারাদিন কম্পিউটারের সামনে কাজ করতেন। ধীরে ধীরে তার শরীরে ক্লান্তি ও কোমরে ব্যথা শুরু হলো। নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার- মাছ, ডিম, দুধ ও সবুজ শাকসবজি গ্রহণ করেন। সুষম খাবার খাওয়ার পরও সে সব সময় ক্লান্তি ও দুর্বলতায় ভুগছিল। তার পেশিতে তীব্র টান পড়ত এবং পিঠ ও ঘাড়ের ব্যথায় সে ঠিকমতো কাজ করতে পারত না। অবশেষে একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে সে কোমরে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করে। অবস্থার অবনতি দেখে সে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়। চিকিৎসক রক্ত পরীক্ষা করে জানান, তার শরীরে ক্যালসিয়াম ঠিক আছে, কিন্তু মারাত্মক ভিটামিন ডি’র ঘাটতি দেখা দিয়েছে। চিকিৎসক তাকে বোঝান, ভিটামিন ডি ছাড়া শরীর খাবার থেকে ক্যালসিয়াম শোষণ করতে পারে না। তাই সুষম খাদ্য খাওয়ার পরও তার হাড় ও পেশি দুর্বল হয়ে পড়েছে। চিকিৎসকের পরামর্শে নিহার তার দৈনন্দিন রুটিনে পরিবর্তন আনে। প্রতিদিন সকালে অন্তত ১৫-২০ মিনিট রোদে থাকার অভ্যাস করে এবং প্রয়োজনে পরিপূরক গ্রহণ শুরু করে। ধীরে ধীরে তার হাড় ও পেশির ব্যথা কমে যায় এবং সে তার পুরোনো কর্মশক্তি ফিরে পায়।
ভিটামিন ডি যাকে প্রায়ই ‘সানশাইন ভিটামিন’ বলা হয়, যা মানবদেহের জন্য অপরিহার্য। ভিটামিন ডি-এর অভাবে মানব দেহে প্রায় ৩০০ ধরণের কেমিকেল সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। তবে আধুনিক জীবনযাত্রা, শহুরে ব্যস্ততা এবং সচেতনতার অভাবে এর ঘাটতি বিশ্বব্যাপী এক মহামারিতে পরিণত হয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে একে ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয় কারণ এর লক্ষণগুলো প্রথমদিকে সূক্ষ্ম এবং দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে, যা শেষ পর্যন্ত হাড়ের দুর্বলতা, হৃদরোগ, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, অটোইমিউন রোগ এবং এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশে এই সমস্যা আরও ভয়াবহ, কারণ প্রচুর সূর্যালোক থাকা সত্ত্বেও জনসংখ্যার বড় অংশ এর অভাবে ভুগছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বিভিন্ন গবেষণা অনুসারে, বিশ্বে প্রায় ১ বিলিয়ন মানুষ ভিটামিন ডি’র ঘাটতি বা অপর্যাপ্ততায় ভুগছে। উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া সব জায়গায় এটি ছড়িয়ে পড়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৪২% প্রাপ্তবয়স্কদের ঘাটতি রয়েছে। ইউরোপে বয়স্কদের মধ্যে ৪০-৫০% এর নিচে লেভেল। দক্ষিণ এশিয়ায় প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ৬৮% এর বেশি ঘাটতিতে ভুগছে এবং বাংলাদেশে এই হার ৬৭ শতাংশ। লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পুরুষের তুলনায় নারীদের মধ্যে এই ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের প্রকোপ বাড়ছে, ভিটামিন ডি একটি অন্যতম নীরব অবদানকারী। গর্ভবতী মায়েদের এ ঘাটতির ফলে শিশুর নিউরাল টিউব ডিফেক্ট, কম ওজন এবং পরবর্তীতে অটিজমের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
শরীরে পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন ডি তৈরি হলে তা দেহের অভিযোজিত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ত্বরান্বিত করে। ফলে দেহের রোগ প্রতিরোধক উপাদান টি-সেল ও অ্যান্টিজেন-সমৃদ্ধ কোষগুলো সক্রিয় হয় এবং দেহকে বাইরের রোগজীবাণু থেকে সুরক্ষা দেয়। ভিটামিন ডি অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি ও ইমিউনোরেগুলেটরি উভয় বৈশিষ্ট্য ধারণ করে, যা দেহের সামগ্রিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সক্রিয় করার জন্য অপরিহার্য। তাই ভিটামিন ডি’র ঘাটতিতে শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন রোগ যেমন, যক্ষ্মা, নিউমোনিয়া, অ্যাজমাসহ অনেক ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া জনিত দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
গবেষণা বলছে, দেহে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি না থাকলে তা ‘সাইটোকিন স্টর্ম’ নামের প্রক্রিয়াকে বাড়িয়ে দেয়; ফলে এই অতিরিক্ত সাইটোকিন দেহের কোষকলাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার মাধ্যমে সংক্রমণের হার বাড়ায়। এই সাইটোকিন একধরনের প্রোটিন যা দেহের রোগ প্রতিরোধক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভিটামিন ডি স্টেরয়েড হরমোন হিসেবে জিন এক্সপ্রেশন নিয়ন্ত্রণ করে; অর্থাৎ দেহের প্রোটিন তৈরিতে নিয়ন্ত্রণকারীর ভূমিকায় থাকে। আর প্রোটিন দেহে মজবুত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলার মূল ভিত্তি। সাম্প্রতিক সময়ের কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ভিটামিন ডি শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ প্রতিরোধে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। বিশ্বজুড়ে কিছু জরিপে দেখা গেছে, যাঁরা কোভিডে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, তাঁদের ৮০ শতাংশেরই শরীরে আগে থেকেই ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি ছিলো।
রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বা ইমিউনিটি বাড়ানো ছাড়াও ভিটামিন ডি দেহের আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজে অংশ নেয়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- দাঁত, হাড় ও মাংসপেশিকে সুস্থ রাখা। পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি না থাকলে দেহে ক্যালসিয়ামের শোষণ ও হাড়ের মিনারালাইজেশন ব্যাহত হয়, যা হাড়ক্ষয়ের সূচনা করে। এর অভাবে শিশুরা রিকেটসে ও প্রাপ্তবয়স্করা অস্টিওম্যালেসিয়াসহ বিভিন্ন হাড়ের রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। এছাড়াও বাচ্চাদের ইমিউনিটি বৃদ্ধিতে বাধা প্রদান করে ও বাচ্চারা ঘন ঘন জ্বর ও ঠান্ডা কাশিতে ভুগে থাকে।
ভিটামিন ডি রক্তে ক্যালসিয়াম ও ফসফেটের সঠিক মাত্রা বজায় রাখে, যা দেহের স্বাভাবিক মাংসপেশির সংকোচন, স্নায়ুর উদ্দীপনা পরিবহন, হাড়ের মিনারালাইজেশনসহ দেহকোষের সার্বিক কার্যকারিতায় সাহায্য করে। এ ছাড়া ভিটামিন ডি দেহে পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরিতে সাহায্য করার মাধ্যমে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। হৃৎপিণ্ড ভালো রাখতে, বিষণ্নতা, আলঝেইমার, খিটখিটে মেজাজ নিয়ন্ত্রণে অর্থাৎ মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতেও ভিটামিন ডি প্রয়োজন। গবেষকদের দাবি বিষণ্ণ ব্যক্তিদের ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট দিলে উন্নতি লক্ষ করা যায়।
সূর্যরশ্মির সংস্পর্শে এলে শরীর নিজেই ভিটামিন ডি তৈরি করতে শুরু করে। সপ্তাহে অন্তত ৩ দিন সকাল ১০টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত সূর্যালোকের সংস্পর্শে অন্তত ১৫ থেকে ২০ মিনিট সময় কাটালে ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার ইউনিট ভিটামিন ডি দেহ গ্রহণ করতে পারে। ভিটামিন ডি মূলত আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি অর্থাৎ সূর্যালোকে থাকে এবং চামড়ার ওপরের ভাগ থেকে শরীরে প্রবেশ করে। কোনো কারণে ব্যক্তি দিনের পর দিন সূর্যের আলোর সংস্পর্শে না এলে ভিটামিন ডি’র অভাব হতে পারে। এ ছাড়া শরীরের অভ্যন্তরে ভিটামিন ডি কার্যকর হওয়ার জন্য কিডনি ও যকৃতের সুস্থতা দরকার হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, আমাদের দেশে ৮০ শতাংশ মানুষের দেহেই ভিটামিন ডি’র অভাব রয়েছে। দৈনন্দিন জীবনে দিনের বেলা বাইরের থেকে অভ্যন্তরে, যেমন বাড়ি বা অফিসে আমরা সময় বেশি কাটাই। কোভিড অতিমারিতে শিশু ও বয়স্করা বাড়ির বাইরে প্রায় যায়নি বলা যায়। তাই এ সময় ভিটামিন ডি’র অভাব আরও প্রকট হয়ে উঠেছিল। সূর্যালোক থেকে ভিটামিন ডি গ্রহণ করা সবচেয়ে সহজ এবং সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
খাবার থেকে মানবদেহ ৩০ শতাংশ ভিটামিন ডি গ্রহণ করে কিন্তু বর্তমানে ডায়েট সচেতন অনেকেই কোলেস্টেরল–সমৃদ্ধ খাবার পুরোপুরি ত্যাগ করেন। দেহে ভিটামিন ডি পর্যাপ্ত পরিমাণে রাখতে হলে সুষম ডায়েটে থাকতে হবে। স্বাস্থ্যকর স্নেহজাতীয় খাবার গ্রহণের মাধ্যমে ভিটামিন ডি পেতে পারি। খাবারে তেলের ব্যবহারের দিকে নজর রাখতে হবে। সাধারণত ডিমের কুসুম, পনির, তেল, ঘি, কডলিভার অয়েল বা কড মাছের তেল, কাঠবাদামের দুধ, ফর্টিফায়েড সিরিয়াল ও জুস, টক দই, সামুদ্রিক ও চর্বিযুক্ত মাছ, রোদযুক্ত পরিবেশে বেড়ে ওঠা প্রাণীর মাংস, সয়াবিন থেকে তৈরি খাবার, গরুর কলিজা, রোদে বেড়ে ওঠা মাশরুম ইত্যাদি থেকে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি পাওয়া যেতে পারে।
ভিটামিন ডি’র অভাবজনিত উপসর্গ তেমন স্পষ্ট বোঝা যায় না। তবে ক্লান্তি ও দুর্বলতা, চুল পড়া, ঘন ঘন সর্দি–কাশি ও অসুস্থ হওয়ার প্রবণতা, ক্ষত পূরণে দেরি, কাজে আগ্রহ কমে যাওয়া, বিষণ্ণতা দেখা দেয়, মাংসপেশিতে ব্যথা হয়। রক্তে ভিটামিন ডি’র মাত্রা নিরূপণ করা যায়। বয়স্কদের চামড়ার নিচে চর্বি বা কোলেস্টেরল কমে গেলে তাঁরা দ্রুত ভিটামিন ডি’র ঘাটতিতে আক্রান্ত হন। বয়স্করা বাড়িতে থাকেনও বেশি। ত্বকে মেলানিন বেশি থাকলে আলট্রাভায়োলেট ঢুকতে পারে না, এ ক্ষেত্রেও ভিটামিন ডি’র ঘাটতি হয়। এ ছাড়া ত্বকে অতিরিক্ত পরিমাণে সানস্ক্রিন ব্যবহারে, রোদ পৌঁছায় না এমন জায়গায় বসবাস, স্থূল শিশু-কিশোর যাদের ত্বকের বিভিন্ন স্থানে কালো অংশ দেখা দিচ্ছে, ধর্মীয় বা অন্য কারণে পোশাকে প্রায় সারা দেহ আবৃত করে রাখা ব্যক্তি, সারাক্ষণ প্রাতিষ্ঠানিক জীবন যাপন (হোস্টেল, হাসপাতাল বা অফিস) করেন এমন মানুষ বেশি ঝুঁকিতে আছেন। ১ থেকে ৭০ বছর বয়সী মানুষের গড়ে প্রতিদিন ৬০০ আইইউ এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সীদের ৮০০ আইইউ ভিটামিন ডি গ্রহণ করা দরকার।
মানবদেহের সুস্থতার চাবিকাঠি লুকিয়ে রয়েছে সূর্যালোক এবং পুষ্টিকর খাবারের সমন্বয়ে। ভিটামিন ডি কেবল হাড়ের সুরক্ষায় কাজ করে না, বরং এটি আমাদের সামগ্রিক ইমিউনিটি সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সচল রেখে বিভিন্ন দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে শরীরকে সুরক্ষা দেয়। আধুনিক ও কৃত্রিম জীবনযাত্রার কারণে আজ অনেকেই এই সহজলভ্য ভিটামিন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সচেতনতা এবং ছোট ছোট অভ্যাসের মাধ্যমেই আমরা ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি প্রতিরোধ করতে পারি। তাই সুস্থ, সবল ও নীরোগ জীবনযাপনের জন্য ভিটামিন ডি-এর দিকে আজই নজর দিন।
লেখক: সহকারী তথ্য অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, খুলনা।









