প্রকাশ : ০৬ জুন ’২৬ খ্রি. শনিবার
নিজস্ব প্রতিনিধি :
বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, মানবিক কার্যক্রম ও আঞ্চলিক কূটনীতিতে সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তুরস্ক। পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট ও বৈশ্বিক শান্তি উদ্যোগে ঢাকার প্রচেষ্টাকে সমর্থন জানিয়ে সম্পর্ক আরও গভীর করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে আঙ্কারা।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান গতকাল শুক্রবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিনের অংশীদারিত্বকে আরও বিস্তৃত পরিসরে গভীর করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি এবং একে দৃঢ় ভিত্তির ওপর আরও শক্তিশালী ও দূরদর্শী পর্যায়ে উন্নীত করতে চাই।’
সংবাদ সম্মেলনে দুই দেশের বর্তমান দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যকে ১৩০ কোটি ডলার থেকে ২০০ কোটি ডলারে উন্নীত করা, তুর্কি বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা এবং ঢাকায় আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার মতো প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ।
কৌশলগত সম্পর্কের বিশেষ বার্তা নিয়ে তিন দিনের সফরে গত বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা এসেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। ২০২০ সালের ডিসেম্বরের পর এটিই কোনো তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রথম বাংলাদেশ সফর। একই সঙ্গে বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গুরুত্বপূর্ণ কোনো দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এটাই প্রথম ঢাকা সফর। চলতি বছরের মার্চ মাসে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান তুরস্কে দ্বিপক্ষীয় সফরে গিয়েছিলেন। এবার দক্ষিণ কোরিয়া সফর শেষে ফিরতি সফরে ঢাকায় এলেন হাকান ফিদান।
প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং তুরস্কের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এমআইটির সাবেক প্রধান হাকান ফিদানকে দেশটির পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতির অন্যতম স্থপতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ কারণে তাঁর এই ঢাকা সফরকে কেবল কূটনৈতিক নয়, বরং গভীর রাজনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ সফর হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
দ্বিপক্ষীয় বৈঠক
সফরের দ্বিতীয় দিনে গতকাল সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়। বৈঠকে নির্ধারিত কোনো আলোচ্যসূচি না থাকলেও বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো স্থান পায়। বৈঠক শেষে দুই দেশের মধ্যে একটি সাংস্কৃতিক বিনিময়বিষয়ক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়।
বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি বাংলাদেশ ফার্স্ট দর্শনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তবে এর অর্থ একা চলা নয়; বরং জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রেখে সমতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলাই এই নীতির মূল কথা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ বন্ধু ও অংশীদার চায়, কোনো প্রভু নয়।
বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) স্বাক্ষরের সম্ভাবনা নিয়েও ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে।
বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও সমর শিল্প
বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রস্তাবগুলোর একটি ছিল তুরস্কের জন্য একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা। দেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলে তুর্কি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি শুধু তাদের জন্যই পৃথক এই অঞ্চলের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এটি বাস্তবায়িত হলে তৈরি পোশাক, বস্ত্র, জাহাজ নির্মাণ, ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং অবকাঠামো খাতে বড় ধরনের তুর্কি বিনিয়োগ আসবে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি দুই দেশের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে প্রতিরক্ষা শিল্প। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান জানান, দুই দেশ প্রতিরক্ষা শিল্পসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের সুযোগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সামরিক প্রযুক্তি, ড্রোনসহ উন্নত প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে তুরস্কের দ্রুত উত্থানের প্রেক্ষাপটে এ খাতে সহযোগিতা বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা ও প্রযুক্তির জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইতোমধ্যে তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক জোরদার করেছে বাংলাদেশ। দুই দেশ যৌথভাবে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উন্নয়ন ও দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রযুক্তি হস্তান্তরভিত্তিক সহযোগিতার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে।
আন্তর্জাতিক ফোরামে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠানো এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশকে সমর্থন দেওয়ায় তুরস্ককে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান ড. খলিলুর রহমান। উল্লেখ্য, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে বাংলাদেশের জয়ের নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে তুরস্ক।
ধন্যবাদ জ্ঞাপনের জবাবে তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান মন্তব্য করেন, জাতীয় নির্বাচনের সফল সমাপ্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। একই সঙ্গে তিনি ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পুরো দেশকে অভিনন্দন জানান।
স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মানবিক সহযোগিতা
অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতার পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতেও তুরস্কের আধুনিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে চায় বাংলাদেশ। এ লক্ষ্যে ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল এবং নার্সিং ইনস্টিটিউট স্থাপন বা উন্নয়নে তুরস্ককে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি, জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষা বৃত্তির সংখ্যা বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছে ঢাকা। বর্তমানে প্রায় তিন হাজার বাংলাদেশি তুরস্কে বসবাস করছেন, যাদের অধিকাংশই শিক্ষার্থী। সরকারের আশা, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময় বাড়লে দুই দেশের সম্পর্ক আরও মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি পাবে।
সংবাদ সম্মেলনে রোহিঙ্গা সংকটও বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রায় এক দশক ধরে চলমান এই সংকটের স্থায়ী সমাধান হলো রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন। হাকান ফিদান বাংলাদেশের মানবিক ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ মানবতার জন্য অসাধারণ দায়িত্ব পালন করছে এবং তুরস্ক ভবিষ্যতেও এই প্রত্যাবাসন প্রচেষ্টার পক্ষে দৃঢ়ভাবে থাকবে।
সফরসূচি অনুযায়ী আজ শনিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তেজগাঁওয়ে তাঁর কার্যালয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন হাকান ফিদান।
জামায়াত নেতাদের সঙ্গে বৈঠক
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান গতকাল শুক্রবার রাতে জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। রাজধানীর একটি হোটেলে বৈঠকে জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা বৈঠকে অংশ নেন।
জামায়াতের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বৈঠকে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট ও ভূ-রাজনৈতিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দুদেশের মধ্যে সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করার ওপর জোর দেওয়া হয়। আলোচনায় দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময়, শিক্ষা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানো এবং প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্বের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। বিরোধীদলীয় নেতা রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে আরও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের জন্য তুরস্ক সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
বৈঠকে জামায়াত নেতাদের মধ্যে ছিলেন, বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের এমপি, দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, সেলিম উদ্দিন এবং জামায়াত আমিরের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান এমপি।
রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে হাকান ফিদান
টেকনাফ (কক্সবাজার) প্রতিনিধি জানান, উখিয়ায় অবস্থিত রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গতকাল দুপুরে ঢাকা থেকে বিমানযোগে কক্সবাজারে পৌঁছানোর পর বিকেল ৪টার দিকে তিনি উখিয়ার বালুখালী ৯ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যান। সেখানে তুরস্কের অর্থায়নে পরিচালিত ফিল্ড হাসপাতালের বিভিন্ন সেবা কার্যক্রম ঘুরে দেখেন এবং রোগীদের খোঁজখবর নেন। পরে তিনি ১৬ ও ১৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। এ সময় ক্যাম্পের রোহিঙ্গাদের জীবনযাত্রা, স্বাস্থ্যসেবা ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রম সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। হাসপাতাল পরিচালনায় নিয়োজিত কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়ও করেন তিনি।








