প্রকাশ : ০৮ জুন ’২৬ খ্রি. সোমবার
জেষ্ঠ্য প্রতিবেদক :
বিএনপি সরকারের ১০০ দিনে খুন হয়েছেন ৬০৫জন, নিযাতনের শিকার সাড়ে ৩ হাজার নারী শিশু, বেড়েছে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই সহ নানা অপরাধ। গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে টিআইবি। সংস্থাটির মতে এ ইতিবাচক উদযোগ থাকলেও দুর্নীতি প্রতিরোধ ও জবাবদিহী প্রতিষ্ঠায় উদযোগের ঘাটতি উদ্বেগজনক।
১৭ ফেব্রুয়ারি ক্ষমতা গ্রহণের পর বিএনপি সরকারের ১০০ দিনের গবেষণা করেন ট্রান্সফারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। জাতীয় সংসদ, বিচার ও নির্বাহী বিভাগ, স্থানীয় সরকার, ব্যাংক ও আর্থিক খাত এবং গণমাধ্যম সহ ৯ টি ক্ষেত্র ছিলো তাদের গবেষণার পরিধি। টিআইবি গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে আসে গত মার্চ-এপ্রিলে দেশে ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি, অপহরণ ও ধর্ষণের চিত্র ছিলো উদ্বেগজনক। টিআইবি তাদের পরিসংখ্যানে দেখায়, গত মার্চ ও এপ্রিলে খুন হয়েছে ৬০৫ জন, ছিনতাই হয়েছে ২৯৪ টি, চুরি ২২১৪টি, নারী ও শিশু নিযাতন হয়েছে ৩৪৯৬টি, ধর্ষণের ঘটনা ৭৮-১০২টি, শিশু ধর্ষণের ঘটনা ৪৯ থেকে ৭১ টি, গণপিটুনি ও মব সহিংসতা ৬৯ থেকে ৮০টি, ডাকাতি ৯০ এবং অপহরণ হয়েছে ১৯৬টি সহ পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ১২৯টি।

ক্যাপশন : ৯ টি বিষয়ের উপর টিআইবি’র গবেষণা প্রতিবেদন। –দেশ সংযোগ
এদিকে সরকারের প্রথম ১০০ দিনে দেশে খুন, অপহরণ, ছিনতাই, ডাকাতি ও নারী-শিশু নির্যাতনের মতো অপরাধ উদ্বেগজনক মাত্রায় ঘটেছে বলে দাবি করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। একই সঙ্গে দুর্নীতি দমন, জবাবদিহি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সরকারের প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। টিআইবি বলেছে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক কয়েকজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের তদন্তে দুদকের ভূমিকা থাকা উচিত। কেউ জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে নয়। টিআইবির ভাষ্য, সরকার একদিকে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছে, অন্যদিকে দুর্নীতি প্রতিরোধ, স্বাধীন ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান গঠন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং দলীয় প্রভাবমুক্ত প্রশাসন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান ঘাটতি রয়ে গেছে।
গতকাল রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সরকারের ১০০ দিন : সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে টিআইবি। সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারের ১০০ দিন একদিকে আশাজাগানিয়া ও সম্ভাবনাময়, অন্যদিকে সুশাসন, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা পূরণে সুনির্দিষ্ট ঘাটতির কারণে উদ্বেগজনক।

দুই মাসে ৬০৫ খুন : টিআইবির প্রতিবেদনের ‘অপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র’ অংশে বলা হয়েছে, মার্চ ও এপ্রিল- এই দুই মাসে দেশে ৬০৫টি খুন, ১৯৬টি অপহরণ, ২৯৪টি ছিনতাই এবং ৯০টি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে চুরির ঘটনা ঘটেছে ২ হাজার ২১৪টি এবং পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ১২৯টি। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ছিল ৩ হাজার ৪৯৬টি।
ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৮ থেকে ১০২ জন, গণধর্ষণের শিকার ৩০ থেকে ৩৬ জন এবং ধর্ষণের শিকার শিশুর সংখ্যা ৪৯ থেকে ৭১ জন। গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৬৯ থেকে ৮০টি। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩১ থেকে ৪২ জন এবং আহত হয়েছেন ৭০ থেকে ১২৫ জন। কারা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ১৪ থেকে ১৮টি। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন একজন। সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির জ্যেষ্ঠ গবেষক মো. জুলকার নাইন বলেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের তৎপরতা বাড়লেও সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি।
বিশেষ করে ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি ও অপহরণের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ঢাকায় সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের প্রায় ৪০ শতাংশই কিশোর।
‘মব সংস্কৃতি’ ও চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি : টিআইবির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সরকার গঠনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া, মব সংস্কৃতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা এবং চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে এর কার্যকর বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। পরিবহন খাত, বাস ও ট্রাক টার্মিনাল, হাটবাজার এবং ব্যবসাবাণিজ্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে চাঁদাবাজির অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগও রয়েছে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, খুন, ডাকাতি, চুরি, ছিনতাই, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, লুটপাট ও অরাজকতার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এগুলো বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মাজার, ধর্মীয় ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনাও অব্যাহত রয়েছে। ঢাকার শাহ আলী মাজার, কুষ্টিয়া ও সিলেটে বাউল ও সুফি ধারার অনুসারীদের ওপর হামলা এবং এক পীরকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাকে সামাজিক সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের জন্য অশনিসংকেত হিসেবে উল্লেখ করেছে টিআইবি।
দুদক কমিশন না হওয়াকে ‘আত্মঘাতী অবস্থান’ : সরকার গঠনের ১০০ দিনের মধ্যেও দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও তথ্য কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ না থাকাকে উদ্বেগজনক বলে মনে করছে টিআইবি। সংবাদ সম্মেলনে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুদকের ক্ষেত্রে সরকার আত্মঘাতী অবস্থান নিয়েছে। কমিশন থাকাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিন মাসেও কমিশন গঠন না হওয়া দুর্ভাগ্যজনক ও বিব্রতকর। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক কয়েকজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের তদন্তে দুদকের ভূমিকা থাকা উচিত।
‘এবার আমাদের পালা’ সংস্কৃতি : প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মী, আমলাতন্ত্র, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এবং বিভিন্ন পেশাজীবীর মধ্যে ‘এবার আমাদের পালা’ সংস্কৃতির চর্চা লক্ষণীয়।
টিআইবির ভাষ্য, পুলিশ, প্রশাসন, বাংলাদেশ ব্যাংক, রাষ্ট্রায়ত্ত ও বাণিজ্যিক ব্যাংক, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয় ও গোষ্ঠীগত বিবেচনায় নিয়োগ ও পদায়নের অভিযোগ রয়েছে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকার গঠনের পর এমন কিছু নিয়োগ হয়েছে, যেগুলো স্পষ্টভাবে দলীয়করণের ইঙ্গিত দেয়। এটি সরকারের ঘোষিত সংস্কার ও সুশাসনের অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ : অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৭টিকে আইনে পরিণত করার উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার সুরক্ষা, গুম প্রতিরোধ এবং দুর্নীতি দমন-সংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইনে সরকার পিছিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্ব বাড়ানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা ক্ষমতার ভারসাম্য ও জবাবদিহির প্রশ্ন তুলছে।
শিক্ষা খাতেও দলীয় প্রভাবের অভিযোগ : সরকার গঠনের পর মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ১৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তবে এসব সিদ্ধান্তের কারণ প্রকাশ করা হয়নি। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, ট্রেজারার, ডিন ও প্রভোস্ট নিয়োগে দলীয় বিবেচনা প্রাধান্য পেয়েছে।
ইতিবাচক উদ্যোগও দেখছে টিআইবি : তবে সরকারের কিছু পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবেও দেখছে সংস্থাটি। সরকারি গাড়ি ও অন্যান্য সুবিধা সীমিত করা, রাষ্ট্রীয় প্রটোকল গ্রহণ না করা, মন্ত্রণালয়ভিত্তিক নজরদারি জোরদার এবং কিছু সংস্কার কার্যক্রম শুরুর উদ্যোগকে ইতিবাচক বার্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ১০০ দিনের কিছু ক্ষেত্রে আমরা ভালো উদ্যোগ দেখতে পাচ্ছি, আবার কিছু ক্ষেত্রে পুরোনো ধারা ফিরে আসার লক্ষণও স্পষ্ট। সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ঘোষিত প্রতিশ্রুতিগুলোকে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা।







