০৮ মে ’২৬ খ্রি. শুক্রবার ৮.৩০ মিনিট
দেশ প্রতিবেদক, মেহেরপুর :
যুদ্ধ শেষ করতে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া এক পৃষ্ঠার সমঝোতা স্মারকে ইরান কী প্রতিক্রিয়া দেখাবে, তা নিয়ে আগ্রহের শেষ নেই। গতকাল বৃহস্পতিবারই তেহরানের এ বিষয়ে মতামত জানানোর কথা। মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের মাধ্যমে তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এ প্রতিক্রিয়া জানাবে। তবে এরই মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, প্রস্তাবে সম্মত না হলে আরও বড় হামলা চালানো হবে। ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রস্তাবটি বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলছেন। তবে এক কর্মকর্তা উষ্মা প্রকাশ করে এটাকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছার তালিকা’ বলে বর্ণনাও করেন।
টানা ৪০ দিন ভয়াবহ যুদ্ধ চলার পর গত ৮ এপ্রিল দুই সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতি হয়। পরে এটি অনির্দিষ্টকালের জন্য দীর্ঘ করেন ট্রাম্প। অন্তর্বর্তী এ সময়ে গোপনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা চলছিল। পর্দার আড়ালের এ কূটনীতিই সমঝোতার সম্ভাবনাকে উজ্জ্বল করেছে। তবে এতে ইরান সম্মত না হলে সব চেষ্টা ভবিষ্যতের অপেক্ষায় পড়তে পারে। যুদ্ধবিরতির পর যুক্তরাষ্ট্র একাধিক প্রস্তাব দিলেও তাতে আগ্রহ দেখায়নি ইরান। তারা চায়, তাদের প্রস্তাবনা অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা করুক।
গতকাল বৃহস্পতিবার দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বজুড়ে ব্যবসায়ী নেতা, ভোক্তা, রাজনীতিবিদ, জাহাজ কোম্পানিসহ অনেকেই একটি যুগান্তকারী সমাধানের বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। এ সংঘাত তৃতীয় মাসে গড়িয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে হরমুজ প্রণালির চারপাশে পাল্টাপাল্টি অবরোধ আরোপ করেছে। এতে বিশ্বের প্রধান তেল পরিবহন পথ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়; লাফিয়ে বাড়তে থাকে জ্বালানির দাম।
যুক্তরাষ্ট্রের এক পৃষ্ঠার সমঝোতা স্মারকের আগে তেহরান ১৪ দফার একটি প্রস্তাব দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রকে। ইরান চায় ওই প্রস্তাবের বিষয়ে যেন আলোচনা হয়। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই গত বুধবার সন্ধ্যায় বলেন, তাঁর সরকার যুদ্ধ শেষ করার জন্য ইরানের ১৪ দফা প্রস্তাবের জবাবে মার্কিন প্রতিক্রিয়া পর্যালোচনা করছে। তারা প্রধান মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানকে প্রতিক্রিয়া জানাবে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম আইআরআইবিকে বাঘাই বলেন, ‘পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে বার্তা আদান–প্রদান চলছে; এসব বার্তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে।’
এ প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরও হামলার হুমকির পর গত বুধবার বলেন, ইরানের সঙ্গে ‘খুব ভালো আলোচনা’ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা ভালো অবস্থায় আছি এবং এখন আমরা ভালোভাবেই এগোচ্ছি। আমাদের যা পাওয়ার তা পেতেই হবে।’ এর আগে দিনের শুরুতে ট্রাম্প ইরানকে একটি নতুন হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, ইরান যদি আপাত ছাড়গুলোয় সম্মত না হয়, তবে ‘অনেক উচ্চতর মাত্রা ও তীব্রতায়’ হামলা পুনরায় শুরু করা হবে। তবে সেই ছাড়গুলো কী ছিল, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানাননি।
এদিকে গতকাল পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের সঙ্গে ফোনালাপে ‘সংলাপ ও কূটনীতির’ ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে আলজাজিরা জানিয়েছে, ফোনালাপে উভয় নেতা আঞ্চলিক পরিস্থিতি ও চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা করেন। এ ছাড়া উত্তেজনা কমাতে সংলাপ অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন তারা।
এ অবস্থায় সমঝোতা হওয়ার বিষয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেছে কাতার। দেশটির প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুল রহমান বিন জসিম আল থানি মনে করেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের কূটনৈতিক সমাধানের ‘প্রবল সম্ভাবনা’ রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র–ইরানের যে কোনো চুক্তিতে এ অঞ্চলের দেশগুলোর ও পুরো বিশ্বের স্বার্থ অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে।
শান্তিচুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়ই ‘বিজয়ের আখ্যান’ চাইছে
কিংস কলেজ লন্ডনের ভিজিটিং লেকচারার সামির পুরি আলজাজিরাকে বলেন, যদিও কোনো পক্ষই একটি পূর্ণাঙ্গ সংঘাতে ফিরতে চায় না, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়ই এমন একটি চুক্তি চাইছে, যা তাদের নিজ নিজ জনগণের কাছে একটি ‘বিজয়ের আখ্যান’ তুলে ধরার সুযোগ দেবে। তিনি বলেন, একটি সমাধানের জন্য ‘সংঘাত মধ্যস্থতার কৌশল’ প্রয়োজন; তাই এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানিদের একটি বড় ভূমিকা পালন করতে হবে।
মোজতবা খামেনির সঙ্গে আড়াই ঘণ্টা বৈঠক পেজেশকিয়ানের
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির সঙ্গে আড়াই ঘণ্টার বৈঠক করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আইআরআইবি জানায়, বৈঠককে পেজেশকিয়ান ‘অত্যন্ত আন্তরিক’ বলে বর্ণনা করেছেন।
ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘এ বৈঠকে অন্য যে কোনো বিষয়ের চেয়ে যা আমার কাছে বেশি লক্ষণীয় ছিল, তা হলো ইসলামী বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতার মুখোমুখি হওয়ার ধরন, তাঁর চাহনি ও তাঁর নম্র ও গভীর অন্তরঙ্গ আচরণ। এটা এমন একটি বিষয়, যা আলোচনার পরিবেশকে আস্থা, প্রশান্তি, সহানুভূতি ও সরাসরি সংলাপের ওপর ভিত্তি করে একটি আবহে রূপান্তর করেছে।’
মার্চের শুরুতে সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার পর মোজতবা খামেনিকে জনসমক্ষে আর দেখা যায়নি। জানা গেছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় তিনি আহত হন। ওই হামলায় তাঁর বাবা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হয়েছেন।
বিশ্ববাজারে আরও কমলো জ্বালানি তেলের দাম
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শেষ করা ও হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার মার্কিন পরিকল্পনার সর্বশেষ অগ্রগতির প্রেক্ষাপটে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আরও কমেছে। সেই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী শেয়ারবাজারে মিশ্র প্রবণতা দেখা গেছে। গত বুধবার ১০ শতাংশ দর পতনের পর গতকাল বৃহস্পতিবার অপরিশোধিত তেলের দাম আরও ৩ শতাংশ হ্রাস পায়। অয়েল প্রাইস ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম ছিল ৯৭ দশমিক ৪৭ ডলার। প্রাকৃতিক গ্যাসের দামও কিছুটা কমেছে।
ফরাসি যুদ্ধজাহাজ হরমুজের দিকে অগ্রসর হচ্ছে
হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌচলাচল পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে একটি সম্ভাব্য প্রতিরক্ষামূলক অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে ফ্রান্সের একটি রণতরী সুয়েজ খালের দক্ষিণ দিকে লোহিত সাগরের দিকে যাত্রা করছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পারমাণবিক শক্তিচালিত শার্ল দ্য গল জাহাজটি প্রণালিটির দিকে যাচ্ছে।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার নৌ চলাচলের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে একটি বহুজাতিক মিশনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যা ‘সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক’ হবে। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরই কেবল এ রণতরী মোতায়েন করা হবে।









